আপনি কি কখনো ভেবেছেন পৃথিবীর কঠিনতম
প্রাণী কোনটি? হয়তো আপনি ভাবছেন এটি বাঘ কিংবা সিংহ হতে পারে। কিন্তু না, আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এমনকি ডাইনোসরও কঠিনতম জীবন্ত অর্গানিজমের মধ্যে পড়ে না! এই সম্মান একটি অনুজীব
অর্জন করেছে যার নাম টার্ডিগ্রেড!
টার্ডিগ্রেড ক্ষুদ্র, সত্যিই অতি ক্ষুদ্র। তারা সাধারণত জলে বাস করে কিন্তু তাদেরকে সমুদ্রের ৪০০০০
ফুট গভীরতায় এমনকি হিমালয়ের ২০০০০ ফুট উঁচুতে পাওয়া যায়।
তাদের রয়েছে ৮টি পা (৪ জোড়া)।
প্রতিটি পায়ে ৪ থেকে ৮টি করে ভাল্লুকের থাবার অনুরূপ রয়েছে। এ কারণে টার্ডিগ্রেডকে
'ওয়াটার বিয়ার' নামে ডাকা
হয়। এরা 'মস পিগলেট' নামেও
পরিচিত কারণ এদেরকে শৈবালেও পাওয়া যায়।
একজন জার্মান যাজক জোহান আগস্ট
ইফ্রয়িম গোয়েজ (Johann August Ephraim Goeze) দ্বারা ১৭৭৩ সালে টার্ডিগ্রেড প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৭৭৬ সালে ল্যাজারও স্পোলানযানি (Lazzaro Spallanzani) নামের একজন ইতালীয় জীববিজ্ঞানী টার্ডিগ্রেড
নামকরণ করেন।
টার্ডিগ্রেডের ১১৫০টিরও বেশি প্রজাতি
১৭৭৮ সালের মাঝে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এরা চরম তাপমাত্রা, অম্লতা, ক্ষারত্ব বা রাসায়নিক ঘনত্বের মধ্যেও বাস করতে পারে।
সাধারণত ০.৫ মিমি পর্যন্ত লম্বা হয়
কিন্তু তারা ১ মিমি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হল
প্রাপ্তবয়স্ক কোষ নিয়ে এদের জন্ম হয়। কোষ বিভাজন দ্বারা এদের বৃদ্ধি ঘটে না। সময়ের
সাথে সাথে তাদের কোষ কেবল আকারে প্রসারিত হয়।
এদের টিকে থাকার অস্তিত্ব কিন্তু
দীর্ঘ সময়ের। ডাইনোসরেরও জন্মের পূর্বে এদের জন্ম! জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে জানা গেছে
যে, ৫৩০ মিলিয়ন বছর যাবত এদের বসবাস।
প্রজাতির অধিকাংশই অণ্ডোত্পাদী,
অর্থাৎ ডিম থেকে এরা জন্ম গ্রহণ করে। নারী টার্ডিগ্রেডরা তাদের চামড়ার আবরণে ডিম
পাড়ে এবং পুরুষরা তাদের শুক্রাণু দিয়ে আবৃত করে সঙ্গীদের ডিমকে। টার্ডিগ্রেড প্রজাতিদের মাঝে অল্প কিছু প্রজাতি
অণ্ডোত্পাদী নয় এবং সেই প্রজাতির মধ্যে নারীরা তাদের অভ্যন্তরীণে ফার্টিলাইজেশন
করে থাকে। অর্থাৎ তাদের অভ্যন্তরে নিষেক ক্রিয়া সম্পাদিত হয়।
তাদের নলাকার মুখের মধ্যে ধারালো
ছুরির মত দাঁত আছে। যা তারা অন্যান্য জীবন্ত প্রাণী ও জলজ উদ্ভিজ্জকে বিদ্ধ করতে
ব্যবহার করে। তারা সাধারণত ব্যাকটেরিয়া বা উদ্ভিদ কোষ খেয়ে বেঁচে থাকে কিন্তু আরো
কিছু প্রজাতি আছে যারা অন্যান্য ছোট প্রাণীকে ভোজন করে জীবন ধারণ করে।
আগেই বলেছি যে এরা চরম তাপমাত্রায়
বেঁচে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা ১৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইটে
তাদের উপর দগ্ধকরণ ক্রিয়া পরিচালনা করেন এবং দেখা যায় টার্ডিগ্রেড কয়েক মিনিটের
জন্য বেঁচে ছিল সেই তাপমাত্রায়!
বিজ্ঞানীরা তাদেরকে -২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বা -৩২৮ডিগ্রী ফারেনহাইটে হিমায়িত করে। তারা সেই তাপমাত্রায় নির্দ্বিধায় বেঁচে
থাকতে পেরেছিল! এমনকি -২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার (যা পরম শূন্য তাপমাত্রার
কাছাকাছি) নিচে রাখা হয় এবং তারা কয়েক মিনিটের জন্য বেঁচে ছিল!
এরা এতটাই অদম্য যে খাদ্য ও পানি
ছাড়া এক দশক (১০ বছর) পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে! এমনকি বিজ্ঞানীরা ১২০ বছরের
পুরোনো শুকনো শেওলা থেকে টার্ডিগ্রেডের সাক্ষাত পেয়েছেন।
চরম ঠান্ডা অবস্থায়, এরা শরীরের জল ঝরিয়ে নিতে সক্ষম। ৮৫% থেকে ৩% অবধি পানি
এরা ঝরিয়ে নেয় শরীর থেকে। কারণ চরম ঠান্ডা অবস্থায় নিজেদের জলশূন্য না করলে তাদের
শরীরে পানি প্রসারিত হবে এবং তাদের শরীরকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এই অবস্থায়
শরীরে trehalose নামক এক ধরণের চিনি ব্যবহার করে
তারা তাদের ঝিল্লির যেকোনো ধরণের ক্ষতিসাধন থেকে বিরত রাখতে পারে।
টার্ডিগ্রেডরা চরম চাপে বেঁচে থাকতে
সক্ষম। প্রজাতির অধিকাংশই অবশ্য ১২০০ বায়ুমন্ডলীয় চাপ সহ্য করতে পারে।
এমনকি কিছু প্রজাতি ৬০০০ বায়ুমণ্ডলীয়
চাপও সহ্য করতে পারে।
যদি আপনি এখনো সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন
তবে জেনে নিন এরা চরম বিকিরণ পর্যন্ত সহ্য করতে সক্ষম। গামা রশ্মির প্রাণঘাতী ডোজ
৫০০০ গ্রে লাগে এদের মারতে। ভারী আয়নের প্রাণঘাতী বিকিরণ ডোজ হচ্ছে ৬২০০ গ্রে!
যেখানে মানুষকে মারতে ৫ থেকে ১০ গ্রেই যথেষ্ট। [গ্রে (প্রতীক: Gy) বিকিরণ ডোজের ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম ইউনিট]
বিজ্ঞানীরা খুঁজে পায় যায় যে,
বিকিরণ দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির পর টার্ডিগ্রেডরা বেশ দক্ষতার সঙ্গে তাদের ডিএনএ কে
মেরামত করতে সক্ষম।
কি? এখনো খুশি হতে পারেননি? তবে জেনে
নিন আরও তথ্য টার্ডিগ্রেড সম্পর্কে। তাদেরকে যদি আপনি বিষাক্ত পরিবেশে রেখে দেন,
তবে সেখানেও তারা টিকে থাকতে সক্ষম। chemobiosis অবস্থায় পদার্পনের ফলে এরা নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে বিষাক্ত
পরিবেশেও।
মানুষের জন্য পরিচিত সবচেয়ে
প্রতিকূল পরিবেশেও তারা বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি মহাকাশেও এরা বেঁচে থাকতে পারে।
তারা ১০ দিন পর্যন্ত মহাকাশে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল।
২০০৭ সালে পরিচালিত একটি পরীক্ষায়
টার্ডিগ্রেডকে জলশূন্যে অবস্থান করানো হয় এবং সৌর জগতে UV বিকিরণ উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ১০ দিন সেখানে
রাখা হয়। পৃথিবীতে এনে পুনরায় জল গ্রহণ করানো হলে ৩০ মিনিটের মধ্যে তারা জীবন
ফিরে পায়। এক সময় দেখা যায় এমন চরম অবস্থা থেকে ফিরে আসার পর তারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে
উঠে এবং টেকসই ভ্রূণ উৎপাদনেও সক্ষম হয়ে উঠেছিল।
ফুটন্ত পানি, কঠিন বরফ, মহাকাশ এমনকি তীব্র
বিকিরণে বসবাস করতে পারে টার্ডিগ্রেড! মরুভূমিতে এক দশক পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে
এক ফোঁটা পানি পান না করে। সমুদ্রের গভীরেও পারে বাস করতে! এমন কঠিনতম জীবন্ত
অর্গানিজম-টার্ডিগ্রেডের অদম্য কার্যকলাপ আমাকে তো বিমোহিত করেছে, আপনাকে করেছে
কি?



ভাল লেখা। 😊
ReplyDeleteধন্যবাদ :)
ReplyDelete